বাংলাদেশে আগামী পাঁচ বছরে ডিজিটাল খাতে ১০ লাখ কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্য তুলে ধরেছে সরকার। ২৭ অক্টোবর ঢাকায় অনুষ্ঠিত Bangladesh TechConnect 2026 সম্মেলনে তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তিমন্ত্রী ফকির মাহবুব আনাম এ পরিকল্পনার কথা জানান। প্রযুক্তিনির্ভর অর্থনীতি গড়ে তোলা এবং বাংলাদেশকে তথ্যপ্রযুক্তি ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা খাতে আঞ্চলিক কেন্দ্র হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার বৃহত্তর পরিকল্পনার অংশ হিসেবে এ লক্ষ্য নির্ধারণের কথা বলা হয়েছে।
সম্মেলনে ভবিষ্যৎ প্রযুক্তি, টেলিযোগাযোগ অবকাঠামো, শিল্প উৎপাদনশীলতা এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার প্রবণতা নিয়ে আলোচনা হয়। সেখানে মন্ত্রী বলেন, ডিজিটাল অর্থনীতির সম্প্রসারণের জন্য নির্ভরযোগ্য ও সাশ্রয়ী উচ্চগতির ইন্টারনেট, আধুনিক টেলিযোগাযোগব্যবস্থা, দক্ষ জনশক্তি এবং বিনিয়োগ বাড়ানো প্রয়োজন। স্থানীয় উদ্ভাবনকে উৎসাহিত করা এবং প্রযুক্তি ব্যবহারের ক্ষেত্রে সাইবার নিরাপত্তা ও ব্যক্তিগত তথ্যের সুরক্ষা নিশ্চিত করার বিষয়েও গুরুত্ব দেওয়া হয়।
ডিজিটাল খাতে কর্মসংস্থান বলতে শুধু সফটওয়্যার প্রকৌশলী বা প্রোগ্রামারদের চাকরি বোঝায় না। এর মধ্যে সফটওয়্যার উন্নয়ন, ওয়েবসেবা, ক্লাউড অবকাঠামো, তথ্য বিশ্লেষণ, ডিজিটাল বিপণন, সাইবার নিরাপত্তা, প্রযুক্তিগত সহায়তা এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক বিভিন্ন পেশার সুযোগ থাকতে পারে। তবে সরকারের ঘোষিত ১০ লাখ কর্মসংস্থানের লক্ষ্যে কোন কোন পেশা অন্তর্ভুক্ত হবে, কতগুলো চাকরি সরাসরি নতুন করে সৃষ্টি হবে এবং কতগুলো বিদ্যমান কাজ ডিজিটাল খাতে স্থানান্তরিত হবে—এসব বিষয়ে বিস্তারিত লক্ষ্যভিত্তিক বিভাজন পাওয়া যায়নি।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহার বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে প্রতিষ্ঠানের কাজের ধরন বদলাচ্ছে। ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলো গ্রাহকসেবা, তথ্য বিশ্লেষণ, নথি ব্যবস্থাপনা, সফটওয়্যার পরীক্ষা এবং বিপণনের কাজে এআইভিত্তিক সরঞ্জাম ব্যবহার করছে। এতে একদিকে কিছু কাজ দ্রুত ও কম খরচে করা সম্ভব হচ্ছে, অন্যদিকে নতুন ধরনের দক্ষতার চাহিদাও তৈরি হচ্ছে। এআই মডেল পরিচালনা, ডেটা ব্যবস্থাপনা, প্রম্পট ডিজাইন, মেশিন লার্নিং, এআই নিরাপত্তা এবং স্বয়ংক্রিয় এজেন্ট পর্যবেক্ষণের মতো ক্ষেত্র ভবিষ্যতে গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।
বাংলাদেশের তরুণদের জন্য এ সম্ভাবনা কাজে লাগাতে প্রশিক্ষণ ও বাস্তব অভিজ্ঞতার মধ্যে সমন্বয় প্রয়োজন। শুধু স্বল্পমেয়াদি কোর্স সম্পন্ন করলেই চাকরি নিশ্চিত হয় না; সমস্যা সমাধানের দক্ষতা, যোগাযোগ, ইংরেজি, প্রকল্পভিত্তিক কাজ এবং প্রযুক্তির বাস্তব প্রয়োগও গুরুত্বপূর্ণ। বিশ্ববিদ্যালয়, প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠান ও প্রযুক্তি কোম্পানির মধ্যে সহযোগিতা বাড়ানো গেলে শিক্ষার্থীরা বাজারের চাহিদা অনুযায়ী দক্ষতা অর্জনের সুযোগ পেতে পারেন।
একই সঙ্গে কর্মসংস্থান সৃষ্টির পরিকল্পনা বাস্তবায়নে কয়েকটি বাধা রয়েছে। দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে উচ্চগতির ইন্টারনেটের সমান সুযোগ নিশ্চিত করা, বিদ্যুৎ ও প্রযুক্তি অবকাঠামোর নির্ভরযোগ্যতা বাড়ানো, স্থানীয় উদ্যোক্তাদের অর্থায়ন এবং দক্ষ কর্মীদের ধরে রাখা গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার কারণে কিছু প্রচলিত কাজের চাহিদা কমতে পারে বলেও আশঙ্কা রয়েছে। তাই নতুন কর্মসংস্থান তৈরির পাশাপাশি কর্মীদের পুনঃপ্রশিক্ষণ এবং প্রযুক্তির পরিবর্তনের সঙ্গে খাপ খাওয়ানোর ব্যবস্থাও প্রয়োজন।
ডিজিটাল খাতে ১০ লাখ কর্মসংস্থানের লক্ষ্য বাংলাদেশের প্রযুক্তি খাতের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ নীতিগত অঙ্গীকার। তবে ঘোষিত লক্ষ্য কতটা বাস্তবায়িত হচ্ছে, তা মূল্যায়নের জন্য নিয়মিত অগ্রগতি প্রতিবেদন, খাতভিত্তিক কর্মসংস্থানের পরিসংখ্যান এবং নতুন চাকরির মান সম্পর্কে তথ্য প্রকাশ করা জরুরি। এসব তথ্য পাওয়া গেলে বোঝা যাবে, পরিকল্পনাটি দেশের তরুণদের জন্য কতটা কার্যকর কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করছে।









০ টি মন্তব্য