অভাবের সংসারে পড়াশোনার খরচ চালাতে একসময় টিউশনি করতেন শরীয়তপুরের তরুণ অনুপ কুমার রায়। নিজের কম্পিউটার কেনার জন্য দীর্ঘদিন টাকা জমিয়ে অবশেষে ৭০ হাজার টাকায় কম্পিউটার কেনেন তিনি। সেই কম্পিউটারেই ডিজিটাল মার্কেটিং শেখা শুরু করে বর্তমানে আন্তর্জাতিক ফ্রিল্যান্সিং বাজারে নিজের অবস্থান তৈরি করেছেন অনুপ। ফ্রিল্যান্সিং থেকে তাঁর আয় ছাড়িয়েছে এক লাখ মার্কিন ডলার।
অনুপের সাফল্যের যাত্রা সহজ ছিল না। পড়াশোনার পাশাপাশি পরিবারের পাশে দাঁড়াতে ২০১৬ সাল থেকে টিউশনি শুরু করেন তিনি। পরে কোচিং সেন্টারেও পড়িয়েছেন। ডিজিটাল মার্কেটিং শেখার আগ্রহ থাকলেও প্রয়োজনীয় কম্পিউটার কেনার মতো অর্থ তাঁর হাতে ছিল না। টিউশনি করে প্রায় ৩৫ হাজার টাকা জমিয়ে এবং বাকি অর্থ মা ও আত্মীয়স্বজনের কাছ থেকে ধার নিয়ে কম্পিউটার কেনেন তিনি।
কম্পিউটার কেনার পর শুরু হয় নতুন করে শেখার লড়াই। প্রথম দিকে একটি প্রতিষ্ঠানে ফ্রিল্যান্সিং প্রশিক্ষণ নিয়েও কাঙ্ক্ষিত সাফল্য পাননি অনুপ। তবে হতাশ হয়ে থেমে না থেকে আবারও শেখার পথে এগিয়ে যান। প্রশিক্ষণের পাশাপাশি গুগলের অনলাইন কোর্স, ইউটিউব এবং বিভিন্ন শিক্ষামূলক উপকরণ ব্যবহার করে নিজের দক্ষতা বাড়াতে থাকেন। নিয়মিত অনুশীলন ও রাত জেগে শেখাই তাঁকে ধীরে ধীরে কাজের উপযোগী করে তোলে।
প্রায় এক বছর চেষ্টা চালানোর পর ২০২২ সালের জুনে ফাইভারে প্রথম অর্থ উপার্জনের সুযোগ পান তিনি। একটি পেইড মিডিয়া প্রকল্পে কাজ করে আয় করেন ২০ ডলার। অঙ্কটি খুব বড় না হলেও তাঁর কাছে সেটি ছিল দীর্ঘ পরিশ্রমের প্রথম স্বীকৃতি। এরপর ফাইভারের পাশাপাশি আপওয়ার্কেও কাজ শুরু করেন এবং লিংকডইনের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে পেশাগত যোগাযোগ বাড়ান।
বর্তমানে অনুপ মূলত পেইড মিডিয়া, গুগল বিজ্ঞাপন পরিচালনা এবং কনভার্সন ট্র্যাকিং নিয়ে কাজ করেন। যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও ডিজিটাল মার্কেটিং এজেন্সির সঙ্গে কাজ করার পাশাপাশি ইউরোপের একটি ফ্যাশন প্রতিষ্ঠানের বিপণন ও ব্যবসা উন্নয়ন কার্যক্রমেও যুক্ত রয়েছেন তিনি।
কাজের পরিধি বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে একক ফ্রিল্যান্সার থেকে উদ্যোক্তা হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছেন অনুপ। নিজ জেলা শরীয়তপুরে একটি ছোট অফিস প্রতিষ্ঠা করেছেন, যেখানে সাতজন কর্মী কাজ করছেন। বর্তমানে তাঁর মাসিক আয় তিন থেকে পাঁচ লাখ টাকা। কোনো কোনো মাসে আয় আট লাখ টাকা পর্যন্ত পৌঁছেছে। ফ্রিল্যান্সিং মার্কেটপ্লেসগুলো থেকে তাঁর মোট আয় এক লাখ মার্কিন ডলারের বেশি।
অনুপের মতে, ফ্রিল্যান্সিংকে রাতারাতি ধনী হওয়ার উপায় হিসেবে দেখলে চলবে না। বরং দীর্ঘমেয়াদি পেশা হিসেবে নিতে হবে। দক্ষতা অর্জন, নিয়মিত অনুশীলন, ক্লায়েন্টের সঙ্গে পেশাদার আচরণ এবং কাজের প্রতি সততা—এসব বিষয়ই দীর্ঘমেয়াদে সফল হতে সাহায্য করে। তাঁর পরামর্শ, নতুনদের অন্তত এক থেকে দেড় বছর ধারাবাহিকভাবে শেখা ও অনুশীলনের মানসিকতা নিয়ে এগোতে হবে।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার দ্রুত বিকাশের সময়েও প্রাসঙ্গিক এআই টুল ও প্রযুক্তি ব্যবহারের দক্ষতা অর্জনকে গুরুত্বপূর্ণ মনে করেন অনুপ। তাঁর অভিজ্ঞতা দেখায়, শুধু প্রশিক্ষণ গ্রহণ করলেই সাফল্য আসে না; শেখা বিষয় বাস্তবে প্রয়োগ করা এবং প্রতিনিয়ত নিজের দক্ষতা উন্নত করাও জরুরি।
টিউশনির টাকা জমিয়ে কেনা একটি কম্পিউটার থেকে আন্তর্জাতিক বাজারে কাজ এবং নিজের প্রতিষ্ঠানে কর্মসংস্থান সৃষ্টি—অনুপ কুমার রায়ের এই যাত্রা বাংলাদেশের তরুণদের জন্য একটি বাস্তব উদাহরণ। তাঁর গল্পের মূল শিক্ষা হলো, সীমিত সামর্থ্য দিয়ে শুরু করেও পরিকল্পিতভাবে দক্ষতা অর্জন ও ধারাবাহিক পরিশ্রমের মাধ্যমে পেশাগত সাফল্যের পথ তৈরি করা সম্ভব।
সূত্র: প্রকাশিত সাক্ষাৎকার ও অনুপ কুমার রায়ের পেশাগত অভিজ্ঞতার বিবরণ।











০ টি মন্তব্য