উন্নত কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবস্থার নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং সম্ভাব্য সাইবার ঝুঁকি মোকাবিলায় নিজেদের সক্ষমতা বাড়ানোর উদ্যোগ নিচ্ছে যুক্তরাজ্য। দেশটির এআইবিষয়ক মন্ত্রী কানিশ্কা নারায়ণ উন্নত এআই মডেল নির্মাতা প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতি নিরাপত্তাব্যবস্থা জোরদার করার আহ্বান জানাতে যাচ্ছেন। একই সঙ্গে শুধু প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোর স্বেচ্ছামূলক উদ্যোগের ওপর নির্ভর না করে যুক্তরাজ্যের নিজস্ব এআই অবকাঠামো ও সাইবার প্রতিরক্ষা শক্তিশালী করার প্রয়োজনীয়তার কথাও তুলে ধরার কথা রয়েছে।
উন্নত এআই ব্যবস্থাগুলো এখন শুধু প্রশ্নের উত্তর দেওয়া বা লেখা তৈরি করার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। বিভিন্ন এআই এজেন্ট ব্যবহারকারীর নির্দেশ অনুযায়ী ওয়েবসাইটে তথ্য খোঁজা, সফটওয়্যার পরিচালনা, নথি তৈরি এবং একাধিক ধাপের কাজ সম্পন্ন করতে পারে। এসব সক্ষমতা ব্যবসা ও সরকারি সেবায় কাজের গতি বাড়াতে পারে। তবে কোনো এআই এজেন্টকে অতিরিক্ত অনুমতি দেওয়া হলে বা তার নির্দেশনা যথেষ্ট স্পষ্ট না হলে সেটি অনাকাঙ্ক্ষিত পদক্ষেপ নিতে পারে। এ কারণে প্রযুক্তি উন্নয়নের পাশাপাশি নিরাপত্তা পরীক্ষা, প্রবেশাধিকার নিয়ন্ত্রণ এবং কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
যুক্তরাজ্যে উদ্বেগ বাড়ার পেছনে বিভিন্ন এআই ব্যবস্থার পরীক্ষাকালীন আচরণ নিয়ে প্রকাশিত প্রতিবেদন রয়েছে। দ্য গার্ডিয়ানের প্রতিবেদনে সাবেক এআই নিরাপত্তা গবেষক জিওফ্রে আরভিং উন্নত মডেল চুরি হয়ে প্রতিপক্ষ রাষ্ট্রের হাতে চলে যাওয়ার ঝুঁকি তুলে ধরেছেন। এ ধরনের মডেল তৈরিতে বিপুল অর্থ, গবেষণা এবং কম্পিউটিং সক্ষমতা প্রয়োজন হয়। কোনো প্রতিষ্ঠানের মডেল বা সংশ্লিষ্ট গুরুত্বপূর্ণ তথ্য অননুমোদিতভাবে হাতিয়ে নেওয়া হলে তা শুধু বাণিজ্যিক ক্ষতির কারণ নয়; জাতীয় নিরাপত্তা ও গুরুত্বপূর্ণ ডিজিটাল অবকাঠামোর জন্যও ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
প্রতিবেদনে ওপেনএআইয়ের একটি নিরাপত্তা পরীক্ষার প্রসঙ্গও এসেছে। নৈতিক হ্যাকিং কর্মসূচির আওতায় গবেষকেরা প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থার দুর্বলতা পরীক্ষা করেছিলেন। এ ধরনের পরীক্ষা সাধারণত অনুমোদিত পরিবেশে করা হয়, যাতে অপরাধমূলক উদ্দেশ্য ছাড়াই দুর্বলতা শনাক্ত করে তা ঠিক করা যায়। তবে পরীক্ষায় কোনো ব্যবস্থায় ব্যাপক প্রবেশাধিকার পাওয়া সম্ভব হলে সেটি নিরাপত্তা নকশা, অনুমতি ব্যবস্থাপনা এবং গুরুত্বপূর্ণ তথ্য সুরক্ষার কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন তোলে। এমন ঘটনা নিজে থেকেই প্রমাণ করে না যে কোনো মডেল স্বাধীনভাবে সব ধরনের নিরাপত্তা ভেঙে ফেলতে পারে; পরীক্ষার পরিবেশ ও বাস্তব হামলার মধ্যে পার্থক্য বিবেচনা করা জরুরি।
এআই নিরাপত্তা নিয়ে যুক্তরাজ্যের আলোচনায় আন্তর্জাতিক সহযোগিতার বিষয়টিও রয়েছে। বিভিন্ন দেশের সরকার উন্নত এআই ব্যবস্থার ঝুঁকি শনাক্ত, মূল্যায়ন এবং নিয়ন্ত্রণের জন্য অভিন্ন নীতিমালা তৈরির সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা করছে। প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোর কাছে মডেল পরীক্ষার সুযোগ, গুরুতর নিরাপত্তা ঘটনার তথ্য প্রকাশ এবং ঝুঁকিপূর্ণ সক্ষমতা ব্যবহারের সীমা নির্ধারণ—এ ধরনের বিষয় নীতিনির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
মাইক্রোসফটের প্রধান নির্বাহী সত্য নাদেলাও উন্নত এআই ব্যবস্থার জন্য কার্যক্রম থামিয়ে দেওয়ার মতো জরুরি নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা রাখার ধারণা তুলে ধরেছেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এর মূল উদ্দেশ্য হলো, কোনো মডেল অপ্রত্যাশিত আচরণ করলে যেন তার কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ ও সীমিত করা যায়।
বাংলাদেশের মতো ডিজিটাল সেবা সম্প্রসারণকারী দেশের জন্যও এসব আলোচনা প্রাসঙ্গিক। ব্যাংকিং, টেলিযোগাযোগ, সরকারি তথ্যব্যবস্থা এবং অনলাইন বাণিজ্যে এআই ব্যবহারের আগে তথ্য সুরক্ষা, অনুমতির সীমা, মানবীয় তদারকি ও সাইবার প্রতিরক্ষা নিশ্চিত করা প্রয়োজন। এআই প্রযুক্তির সুবিধা কাজে লাগানোর পাশাপাশি সম্ভাব্য ঝুঁকি শনাক্ত করার সক্ষমতা তৈরি করতে পারলেই প্রযুক্তির ব্যবহার আরও নির্ভরযোগ্য হবে।










০ টি মন্তব্য