“অনেকের মধ্যেই এ উদ্বেগ কাজ করছে যে এআই মানুষকে অপ্রয়োজনীয় বা বেকার করে দেবে। আমি এই মতামতের সঙ্গে সম্পূর্ণ দ্বিমত পোষণ করি।”
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই মানুষের চাকরি কেড়ে নেবে বিশ্বজুড়ে যখন এমন আতঙ্ক কাজ করছে তখনই ঠিক উল্টো সুর গাইলেন অ্যামাজনের সহপ্রতিষ্ঠাতা জেফ বেজোস।
প্যারিসে আয়োজিত এক প্রযুক্তি সম্মেলনে তিনি দাবি করেছেন, এআই মানুষকে বেকার করবে না, বরং এর ফলে কাজের নতুন সুযোগ তৈরি হবে ও শ্রমের চাহিদা আরও বাড়বে।
বেজোসের যুক্তি, এ প্রযুক্তি আসলে নতুন সুযোগের দুয়ার খুলে দেবে এবং মানুষের শ্রমের চাহিদা আরও বাড়িয়ে তুলবে। বেজোসের এ বক্তব্য অন্যান্য অনেক প্রযুক্তিবিদ ও রাজনৈতিক ব্যক্তির মতামতের সম্পূর্ণ উল্টো।
বিবিসি লিখেছে, যুক্তরাজ্যের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ঋষি সুনাক বর্তমানে মাইক্রোসফট ও এআই কোম্পানি অ্যানথ্রপিকের উপদেষ্টা হিসেবে কাজ করছেন। সম্প্রতি তিনি বলেছিলেন, এআই তরুণদের কর্মসংস্থানের সম্ভাবনার ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।
বেজোস বলেছেন, “আমি জানি অনেক স্মার্ট মানুষসহ অনেকের মধ্যেই এ উদ্বেগ কাজ করছে যে এআই মানুষকে অপ্রয়োজনীয় বা বেকার করে দেবে। আমি এই মতামতের সঙ্গে সম্পূর্ণ দ্বিমত পোষণ করি। আমার ধারণা, বাস্তবে এআইয়ের কারণে উল্টো শ্রমিকের ঘাটতি তৈরি হবে।”
সমাজে এআইয়ের ভবিষ্যৎ ভূমিকা নিয়ে এক আশাবাদী চিত্র তুলে ধরে বেজোস বলেছেন, মানুষের সীমাবদ্ধতা তার উচ্চাকাঙ্ক্ষার অভাবে নয়, বরং এমন কিছু বাধার কারণে, যেগুলো প্রযুক্তির সাহায্যে দূর করা সম্ভব।
বিলিয়নেয়ার উদ্যোক্তা বেজোস তার নতুন এআই উদ্যোগ প্রমিথিউস সম্পর্কে কথা বলার সময় এমন মন্তব্য করেছেন। এ উদ্যোগটি ফিজিক্যাল ম্যানুফ্যাকচারিং বা ভৌত উৎপাদন শিল্পকে গতিশীল করার দিকে মনোযোগ দিচ্ছে। বিশেষ এ খাতটিই দিন দিন স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থানির্ভর হয়ে উঠছে।
এদিকে, যুক্তরাজ্যের ‘ট্রেডস ইউনিয়ন কংগ্রেস’ সতর্ক করে বলেছে, এআই প্রযুক্তি ‘শিল্পায়নের বিপর্যয়’-এর পুনরাবৃত্তি ঘটাতে পারে, যেখানে বিনিয়োগকারীরা আরও ধনী হবে এবং কর্মসংস্থান সংকুচিত হবে। তবে তারা এও বলেছে, সঠিকভাবে কাজে লাগানো গেলে এআইয়ের রূপান্তরমূলক সম্ভাবনা রয়েছে, যার উৎপাদনশীলতার সুবিধা কর্মীরাও পেতে পারেন।
চাঁদে স্থায়ী ঘাঁটি
প্যারিসে ইউরোপের সবচেয়ে বড় প্রযুক্তি প্রদর্শনী ‘ভিভাটেক’-এ এসে বেজোস মহাকাশ অভিযান নিয়ে তার দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনার কথাও তুলে ধরেছেন।
মহাকাশকে তিনি ‘চাহিদার চেয়ে জোগানের সীমিত’ থাকা এক ক্ষেত্র হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তার ভাষায়, মহাকাশে পৌঁছানোর সুযোগের অভাবই এ খাতের ভবিষ্যৎ উন্নয়নের সবচেয়ে বড় বাধা।
তিনি বলেন, পৃথিবীর বাইরে মানুষের বিস্তৃতির জন্য আমাদের সবচেয়ে কাছের ও খনিজ সম্পদে ভরা চাঁদই হতে পারে প্রথম স্বাভাবিক পদক্ষেপ।
উপস্থিত দর্শকদের উদ্দেশ্যে বেজোস বলেছেন, “আমরা চাঁদে কেবল ঘুরতে যাচ্ছি না, সেখানে স্থায়ীভাবে থাকার জন্য যাচ্ছি। ইলেক্ট্রোলাইসিস বা তড়িৎ বিশ্লেষণের মতো প্রযুক্তি ব্যবহার করে একসময় চাঁদের সম্পদ দিয়েই রকেটের জ্বালানি তৈরি করা সম্ভব হবে, যা পৃথিবীর বাইরে মানুষের স্থায়ী উপস্থিতি নিশ্চিত করতে সাহায্য করবে।”
আলোচনায় স্বাভাবিকভাবেই চলে আসে বেজোসের আরেকটি কোম্পানি ‘ব্লু অরিজিন’-এর প্রসঙ্গ। গেল মে মাসে ফ্লোরিডার কেপ ক্যানাভেরালে মাঠ পর্যায়ের পরীক্ষার সময় চালকহীন ‘নিউ গ্লেন’ রকেট বিস্ফোরিত হওয়ায় কোম্পানিটি বড় ধরনের ধাক্কা খেয়েছে।
সেদিনের ঘটনা মনে করে বেজোস বলেছেন, “এমনটা পুরো দলের জন্যই একটা বড় ধাক্কা ছিল। তবে এরপর আমরা বুঝতে পেরেছি আমরা আসলেই খুব ভাগ্যবান ছিলাম।”
এ বিস্ফোরণে কেউ হতাহত হয়নি। বেজোস বলেছেন, রকেট উৎক্ষেপণের বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো, বিশেষ করে প্রপেলান্ট ও ফুয়েল সিস্টেম বা জ্বালানি ব্যবস্থা এ যাত্রায় বেঁচে গেছে, যা নতুন করে তৈরি করতে অনেক সময় লেগে যেত।
বেজোসের সঙ্গে একই মঞ্চে উপস্থিত ছিলেন ব্লু অরিজিনের প্রধান নির্বাহী ডেভ লিম্প। তিনি বলেছেন, উৎক্ষেপণ কেন্দ্রে পুনর্নির্মাণের কাজ এরইমধ্যে শুরু হয়েছে এবং কোম্পানিটি আশা করছে, এ বছরের শেষ নাগাদ তারা পুনরায় রকেট উৎক্ষেপণ শুরু করতে পারবে।
পৃথিবীর বাইরের এ বড় অবকাঠামোর বাজারে ইলন মাস্কের স্পেসএক্সের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাণিজ্যিক মহাকাশ ভ্রমণ ও চন্দ্রাভিযানের দৌড়ে অন্যতম প্রধান শক্তি হিসেবে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করতে লড়ছে ব্লু অরিজিন।
মূল মঞ্চের আলোচনার বাইরে এ প্রদর্শনীর অন্যতম আকর্ষণ ছিল ‘ইউনিট্রি’র হিউম্যানয়েড রোবট। রোবোটিক্সের এ আধুনিক অগ্রগতি দেখার জন্য দর্শনার্থীদের উপচে পড়া লম্বা লাইন লক্ষ্য করা গেছে বলে লিখেছে বিবিসি।
এ প্রদর্শনীটি ভবিষ্যৎ পৃথিবীতে মানুষ ও যন্ত্র কীভাবে একসঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে কাজ করতে পারে তারই একটি ঝলক দেখিয়েছে। পাশাপাশি এবারের ভিভাটেক প্রদর্শনীর একটি বড় প্রবণতাকেও ফুটিয়ে তুলেছে, যেখানে এআই এখন আর কেবল চ্যাটবটের মধ্যে সীমিত নেই, বরং তা বাস্তব দুনিয়ায় পা রাখছে।








-medium.jpg)
০ টি মন্তব্য